আম্মু একটা পাকা আম দাওনা। বাংলা অসাধারণ গল্প

0
78

– আম্মু একটা পাঁকা আম দাও না…

– আম? তুই? তুই আম খাবি?

– হ্যা খুব খেতে ইচ্ছে করছে আজ…

– ওহ…আল্লাহ আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন আজ! আমার ছেলে খাবে আম…

– কি হইছে? দাও না…

– দাঁড়া দিচ্ছি…

আমি আম চাওয়াতে আম্মুর খুশি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কারন এই জিনিসটা আমার একদমই ভাল লাগতো না। আম্মু বলতো, “গাছের লটকানো ফল, হলুদ মৌসুমি ফল খেতে হয়” কত চেষ্টা করেছে আমাকে আম খাওয়ানোর জন্য কিন্তু আমি আম খাওয়া দূরে থাক আমের দিকে তাকাতামই না।

তাই আম্মুর কাছে আম চাওয়ায় আম্মু একদম অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যাই হোক পরে বেছে বেছে বড় পাঁকা দেখে একটা আম দিয়েছিলেন আমাকে। আমি আমটা নিয়ে বাইরে চলে আসছিলাম। আম্মু ডেকে বললেন, “কই যাস? এখানেই খা আমার সামনে!”

– না আমি পরে খাবো।

– তো এখন আম নিলি কেন?

– বাইরে খাবো তো তাই।

– তোর মতলব কি? কাউকে আবার দিবি না তো?

– না না…আমিই খাবো।

– খাওয়ার পরে আমের চোঁচা টা রাস্তায় ফেলবিনা কিন্তু…

– আচ্ছা আম্মু।

চলে আসলাম বাইরে। আমার গন্তব্য স্থান হলো পুকুরের পাশের তেঁতুল গাছটার নিচে। গিয়ে দেখি ভোঁটকা আমিরুল চলে এসেছে। ওর কাছে দুইটা আম। আমি এমনটাই আশা করেছিলাম। ও খুব খেতে পারে, খেয়ে খেয়ে ভোঁটকা হইছে। তাই ওর বাসায় আম চাইলে সাথে সাথেই দিয়ে দিবে। আর দিবেও বেশি করে। তাই ওকে দুইটা আম দিয়েছে হয়তো। একটা আম তো ওর গলা দিয়েই ঢুকবে না।

একটু পর রাজু আর আলাল চলে আসলো। ওদের হাতেও একটা করে আম। আম গুলা জড়ো করলাম। মোট পাঁচটা পাঁকা আম।

আমের দিকটা সম্পুর্ণ হলো, কিন্তু এখন সব চাইতে কঠিন কাজটাই বাকি রয়ে গেছে। তা হলো দুধের দিকটা। এবং সময় আজ সন্ধ্যে পর্যন্ত্য। কারন এই গরমে এই পাঁকা আম গুলা আজকের দিনটাই টিকে থাকবে। তারপর পঁচে যাবে।

**

মূল ঘটনায় আসি।

আমাদের বাড়ির পাশেই অদূরে বাঁশঝাড়। আর তার ঠিক পাশেই এক বুড়ির ছোট্ট কুঁড়েঘর। বুড়িকে আমরা “আমিরুলের নানী” বলেই চিনি। সেই কুঁড়েঘরে বুড়ি আর তার বুড়া থাকে। বুড়ির চারটা ছেলে, দুইটা মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে আর ছেলেরা বিয়ে করে দুরেই বাসা বানিয়ে আলাদা থাকে। তারা ভূলেও বুড়ি আর বুড়াকে দেখতে আসেনা।

বুড়াকে আমরা পিচ্চিরা সব সময়ই একটা মাদুরের উপর শুয়ে থাকতে দেখি। বারান্দায় একটা কাঁথা গায়ে দিয়ে চিৎপটাং হয়ে পরে থাকে। কোন নড়ন চড়ন দেখিনি কখনো। বুড়ি কে প্রায় সময়েই আমরা এক অদ্ভুত কাজ করতে দেখতাম। তা হলো পুকুরের পাশে নষ্ট ব্যাটারীর স্তুপ থাকতো। আর সেই নষ্ট ব্যাটারী গুলাকে বুড়ি একটা ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতো। পরে জেনেছিলাম বুড়ি নিজেই কোথা থেকে ওসব ব্যাটারী জোগাড় করে আনতো। তারপর হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ব্যাটারী গুলার মাথায় যে পিতলের টুপি বা ক্যাপ থাকে ওটা বের করে জমাতো। একবারে অনেক গুলা হলে বুড়ি সেগুলা বিক্রি করতো।

তবে বুড়ির আরেকটা কাজ ছিল তা হলো সে একটা ছোট্ট ঢাকি (বাঁশ দিয়ে বানানো ঝুরি) তে করে কিছু আলতা, চুড়ি, রঙ্গিন ফিতা, ব্যান্ড, সুঁই, চিরুনী, টিপ আরো অনেক কিছু নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতো। এভাবে বলতো, “নিবেন নাকি মাগো আলতা, চিরুনী, খোপা, টিপ…কম পয়সায় দিয়া দিমুনে মা গো…নিবেন নাকি?” এভাবে সেগুলা বিক্রি করতো। কোন কোনদিন দেখা যেত সে কোথা থেকে কিছু নষ্ট ব্যাটারী যোগাড় করেছে। সেগুলা নিয়ে এসে সেই ব্যাটারীর স্তুপে ফেলে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতো।

আমরাও সেখানে ভিড় করতাম ব্যাটারির চকের লোভে। আসলে যেই কালো কার্বন দন্ডের উপর পিতলের টুপিটা বসানো থাকে সেটাকেই আমরা চক বলে ডাকতাম। তো সেই দন্ড টা নিয়ে আমরা একটা দালান বাড়ি ছিল তার গায়ে আঁকিবুঁকি করতাম। অবশ্যই সেই দালান বাড়ির মালিকের চোখ এড়িয়ে।

তো বুড়ির স্বামী ছিলো অসুস্থ, তাই সব সময় কাঁথা গায়ে দিয়ে পরে থাকতো বারান্দায়। এবং সব কিছু বুড়িকে একাই সামলাতে হতো। যেমন সকালে বুড়ার পায়খানা-প্রস্রাব পরিষ্কার করা, ঘর দোর ঝাড়ু দেয়া, রান্না করে বুড়া কে খাওয়ানো, নিজে কিছু মুখে দিয়ে সেই হরেক রকমের জিনিসে ভর্তি ঢাকি নিয়ে বেরিয়ে পরা এবং দুপুরে এসে সকালে রান্না করে রাখা খাবার বুড়াকে খাওয়ানো, তারপর আবার বেরিয়ে পরা এবং বিকেলে এসে ব্যাটারী ভাঙা ইত্যাদী। বুড়ির যেই জিনিসটা আমাদের ভাল লাগতো তা হলো তার মুখে একটাও দাঁত ছিলো না, তাই যখন কথা বলতো এবং হাসতো তখন তাকে দেখতে মজা লাগতো। আর তার ঠুকঠুক করে হাঁটাটাও কেন জানি ভাল লাগতো আমাদের পিচ্চিদের।

**

আমাদের বাসা থেকে নিষেধ ছিল যাতে সকালে সেই বুড়ির বাসার আশেপাশে না যাই আমরা। কারন ছিলো বুড়ির তখন রান্না করার সময়, সে একেবারে দুপুরের মনে রান্না করতো। তো সকালে তার রান্না করার সময় যদি কোন পিচ্চিকে দেখতো তাহলে সে কিছুতেই পিচ্চিকে আসতে দিতো না। কারন রান্না হলে একসাথে খাবে সে জন্য। তার একটা বড় গামলা আছে যেটাতে নাকি সে আগে একবারে খাবার মাখাতো তারপর তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে একসাথে খেতো। এবং তাই আমাদের কোন পিচ্চিকে পেলে সেই গামলা বের করে এক সাথে খাবার খাওয়াতো। আর আমাদের নিষেধ ছিলো এ জন্য যে বুড়ি ছিলো গরিব, তার উপরে অসুস্থ স্বামী। দেখা যায় আমরা গেলে যাই রান্না করুক না কেন আমাদের ধরে এক সাথে খাওয়াতো। আর এতে করে দেখা যেত সে নিজে কম খেতো বা দুপুরে তাকে না খেয়ে থাকতে হতো। তাই তার খাবারের সঙ্কট সৃষ্টি না করার লক্ষ্যে আমাদের আম্মু নিষেধ করে দিয়েছিলো সকালে যাতে তার বাসার দিকে না যাই।

তো পরে বুঝলাম বুড়ি ছিলো একা। কথা বলার মত কেউ ছিলো না তার কাছে। সঙ্গ দেয়ার কেউ নাই। আমাদের পিচ্চিদের দেখলে সে খুব খুশি হতো আর নিশ্চইই সে আগের মত একসাথে খেতে চাইতো। তাই আমাদের খাওয়াতো।

একবার মনে আছে চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে তার বাসার দিকে চলে এসেছিলাম। তখন তিনি জোর করে আমাদের খিচুড়ি খাইয়েছিলেন। ঘাঁটা-খিচুড়ি। যেহেতু তার দাঁত নাই সেহেতু তিনি সব সময় এমন তরল বা নরম জাতীয় খাবারই রান্না করতেন। তিনি সেই গামলা বের করেছিলেন। পাতিলের সব খিচুড়ি ঢেলে আমাদের চারজন কে একসাথে বসিয়ে খাইয়েছিলেন। খিচুড়ির স্বাদ টা অতুলনীয় ছিলো। এখনো সেই দৃশ্যটা আমার চোখে ভাসে। বুড়ির চোখে কেমন খুশি খুশি আভা দেখেছিলাম আমি।

এবং একদিন অসুস্থ বুড়াটা মারা গেলো। বুড়ি দুপুরে এসে খাবার খাওয়াতে গিয়ে দেখেন যে বুড়া মুখ খুলে না, কোন সাড়াশব্দ নাই। বেশ অনেকক্ষণ পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার স্বামী আর নেই। বুড়ির সে কি কান্না। তার কিছু কথা আমার মনে আছে, তিনি বার বার বলছিলেন তিনি নাকি বেঁচে ছিলেন একমাত্র তার স্বামীর জন্যেই। এখন তিনি কি জন্যে বেঁচে থাকবেন। বার বার আল্লাহ কে বলছিলেন তাকেও নিয়ে যেতে।

সেদিনই প্রথম বুড়ির ছেলে মেয়েগুলাকে এক সাথে দেখেছিলাম আমরা। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে এসেছিলো।

**

তারপর থেকে বুড়ির কাজকর্ম সব থেমে গেলো। তিনি ঢাকি নিয়ে আর বের হতেন না। অনেক গুলা ব্যাটারি পরে থাকে স্তুপে, বুড়ি সেগুলাও ভাঙতেন না। তার ছেলের বাসা থেকে তাকে খাবার দিয়ে যেতো। আমি খেয়াল করে দেখেছিলাম আমি যতটুকু খাবার খেতাম তার চেয়েও কম খাবার দেয়া হতো।

আমরা সেদিন বুড়ির কাছে গেছিলাম। আমাদের দেখে পাটিতে শুয়া থেকে উঠে বসেছিলেন। সেদিনের কিছু কথা আমার এখনো মনে আছে…তিনি বলেছিলেন,

– আয় তোগ দুয়া কইরা দি। তুরা কি হইতে চাস বড় হইয়া?

আমিরুল বলেছিলো, “আমি দুকান দিতে চাই, যেই দুকানে ম্যালা লজেন থাকবি”
আমিরুল ছিলো ভোঁটকা খাদক, তাই তার তেমন হতে চাওয়ায় অবাক হইনি আমরা কেউই।

আলাল বলেছিলো, “আমি ভ্যান চালাইতে চাই”
ভ্যানে চড়ে তার মনে হয়েছিলো ভ্যান চালানোটা হয়তো মজার কোন কাজ তাই এমন হতে চেয়েছিলো।

রাজু বলেছিলো, “আমি রেডুয়ার ভিত্রে ঢুইকা গান গাইবার চাই”
একজনের রেডিও ছিলো। সেই রেডিও তে গান হতো। সে ভাবেছিলো রেডিওর ভেতরে ঢুকে গান গাওয়াটা মজার জিনিস। তার স্বপ্ন ছিলো রেডিওর সেই ছোট্ট বাক্সে ঢুকে গান গাবে আর আমরা সবাই শুনবো।

আমি বলেছিলাম, “আমি ডাক্তর হইতে চাই” আম্মু শিখিয়ে দিয়েছিলো আগেই যে কেউ এমন ধরনের প্রশ্ন করলে আমি যাতে এই উত্তর দেই।

তখন বুড়ি আমাদের এই বলে দোয়া করেছিলেন যে, “দুয়া করি তুরা যাতে ভালা মানুষ হইস, আমার পুলামাইয়াগো মত যাতে না হইস”

সেদিন না বুঝলেও আজ বুঝি একটা মা মনে কতটুকু ক্ষোভ জন্মালে নিজের ছেলে মেয়েদের উপর এমন মনোভাব নিয়ে আসতে পারেন।

সেদিন আমি বলেছিলাম, “আমরা বড় হইলে আপনি কি নিবেন?”

তিনি হেসে বলেছিলেন, “একদিন আমারে আম দুধ ভাত খাওয়াইস…ম্যালা বচ্ছর হইলো খাইনা”

তার কথা শুনে সেদিনই মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম বুড়িকে আম দুধ ভাত খাওয়াবো।

কিন্তু দিন দিন বুড়ির অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। সারাক্ষণ কাশতো। মাঝ রাতেও তার কাশির শব্দ শুনতে পেতাম। তার ছেলেরা এগিয়ে আসতো না। তারা হয়তো আপদ বিদায়ের অপেক্ষায় ছিলো।

**

তো বুড়ির অবস্থা দেখে আমি সবাইকে বলি বুড়িকে আম দুধভাত খাওয়ানোর কথা। আলাল, রাজু, আমিরুল রাজী হয়। আমাদের আমও যোগার হয়ে যায়। শুধু বাকি দুধ। এটা কিভাবে পাবো সেটাই চিন্তা করছিলাম আমরা। কারন দুধ চাইলে কখনোই বাসা থেকে দিবেনা। আর বুড়িকে দিবো এই কথা বলার সাহসও ছিলো না আমাদের।

তখনই আলাল আমাদের বুদ্ধি দিলো, বুড়ির যেই ব্যাটারি গুলা পরে আছে ওগুলার পিতলের টুপিটা বের করে আমরা বিক্রি করতে পারি। যেই দোকানে বুড়ি সেগুলা বিক্রি করতো সেই দোকান আলাল চিনতো।

আমরা পিচ্চিরা কাজে লেগে পরলাম। রাজুর বাবার একটা হাতুড়ি ছিল সে সেটা নিয়ে আসলো, আমি চুপিচুপি বুড়ির হাতুড়ি টা আনলাম। আমিরুল আর আলাল কিছু ইট যোগাড় করে সেগুলা দিয়ে ব্যাটারী ভাঙ্গা শুরু করলো।

কালিতে মাখামাখি অবস্থায় কাজ শেষ হলো আমাদের। আমরা বাসায় গিয়ে পানি দিয়ে ধুলাম। তারপর সেই দোকানের দিকে এগুলাম।

দোকানী আমাদের মত পিচ্চিদের হাতে ওসব দেখে সন্দেহ করলো, আমাদের বাবার নাম, কোথায় থাকি জিজ্ঞেস করা শুরু করলো। সত্যি বলতে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা তাই দৌড় দিয়ে চলে এসেছিলাম।

দুপুরের পর মন খারাপ করে বসে ছিলাম আমরা। ওগুলা বিক্রি করতে পারলাম না। তখন আমিরুল বললো ওর কাছে তিন টাকা আছে। বাবা দিয়েছিলো। এটা আগেই ভাবা উচিত ছিল আমার, তো আমি তখন সবাইকে বললাম কার কাছে কত টাকা আছে?
আলালের কাছে ছিলো দেড় টাকা বাসায়, রাজু বললো ও ওর মায়ের কাছ থেকে নিতে পারবে দুই টাকার মত। সমস্যা ছিল আমার। আমাকে আব্বু বা আম্মু টাকা দিতো না। কিছু নিতে ইচ্ছে হলে আব্বু বাজারে নিয়ে গিয়ে আমাকে কিনে দিতো।

ওদের টাকা নিয়ে আসতে বলে আমি বাসায় গেলাম। আম্মুর কাছে টাকা চাওয়ার সাহস নাই। চাইলেই হাজারটা প্রশ্ন করবে। দুরুদুরু বুকে আব্বুর ঘরে ঢুকলাম। আলনায় আব্বুর শার্ট। পকেটে হাত চালিয়ে কিছু নোট পেলাম। প্রচন্ড হাত কাঁপছিলো। পারলাম না। টাকাগুলা আবার পকেটে রেখে দিলাম। ভয় ছিল যদি আব্বু বুঝতে পারে!

ঠিক তখনই আম্মুর মাটির ব্যাংকের দিকে চোখ গেলো আমার, যেখানে কয়েন টাকা রাখা হয়। আমি জানতাম কিভাবে মাটির ব্যাংক থেকে টাকা বের করতে হয়। আমার বড় আপুকে বের করতে দেখেছিলাম আমি।

বাইরে এসে দেখলাম আম্মু বাসায় নাই। এইতো সুযোগ। একটা ঝাটার খিল নিয়ে মাটির ব্যাংক টা হাতে নিলাম। ফোকর দিয়ে খিলটা ঢুকিয়ে দিলাম তারপর ব্যাংকটা ঝাকি দিলাম একটু। কিছু কয়েন ফোকরের মাথায় চলে আসলো। সেগুলা ঝাঁটার খিলের সাথে বাধিয়ে টান দিলাম। কিন্তু বের হচ্ছিলো না। এটা ভাবছিলাম সহজ কাজ, এখন দেখি কঠিন। কয়েনের ঝনঝন শব্দে ভয় পাচ্ছিলাম যদি আম্মু শুনতে পায়…

যাই হোক বহু কষ্টে সেদিন পেরেছিলাম। মোট তিন টাকা বের করতে পেরেছিলাম। সেদিনই প্রথম ধরতে গেলে টাকা চুরি করেছিলাম।

তারপর সব ঠিক যায়গায় রেখে দৌড় দিয়ে সেই তেঁতুল গাছের নিচে গিয়েছিলাম। আমাদের মোট টাকা হয়েছিলো সাড়ে নয়। দুধ যোগাড় করার দায়িত্ব টা আমার উপরেই পরেছিলো যেহেতু আমিই প্রতিদিন পাশের গোয়ালার বাসায় গিয়ে আমাদের বাসার জন্য দুধ নিয়ে আসি।

আমার মনে আছে সেদিন একটা বড় কচু পাতা নিয়ে গোয়ালাকে গিয়ে বলেছিলাম আমাদের দুধের সাথে এই পাতায় সাড়ে নয়টাকার দুধ দিতে। তিনি বলেছিলেন কার জন্যে? আমি বলেছিলাম এটা আমার আপু নিবে আলাদা করে, আমরা পিকনিক করবো দুধ ভাত দিয়ে।

যদিও দুধ ভাত দিয়ে পিকনিকের কথা শুনে অবাক হয়েছিলো গোয়ালা তবুও যখন সে দুধ দিলো পাতায় সেদিন বিশ্ব জয় করার মত খুশি হয়েছিলাম।

**

আম দুধ নিয়ে বুড়ির বাসায় গেলাম বিকেলে। তিনি একটু পর পর কেশেই চলেছেন। আমাদের দেখে কোনমতে উঠে বসলেন। তবে অবাক হলেন আমাদের হাতের আম দুধ দেখে। বললেন,

“তুরা এগুলান কই পাইছোত?”

আমি বললাম, “আম্মু দিছে আপনাকে দেয়ার জন্য”
আমি খেয়াল করে দেখলাম বুড়ির চোখে পানি। সে দোয়া করলো, “দুয়া করি তোগ মায়েরা যেন ম্যালা বচ্ছর বাইচা থাকে।”

বুড়ি আমাদের সেই পাটিতে বসতে বললেন। আমরা জানতাম আমাদের না খাইয়ে ছাড়বেন না। পাটির পাশে দেখলাম দুই বাটি ভাত তরকারি। তারমানে সকাল আর দুপুরে তার ছেলেরা খাবার দিয়ে গেলেও বুড়ি খায়নি। কেন খায়নি কে জানে?

বুড়ি টলতে টলতে তার চুলায় আগুন জ্বালালেন। ধোয়ায় আরও বেশি কাশতে শুরু করলেন। কাশতে কাশতে কোনরকমে দুধটা জ্বাল দিলেন।

তারপর দুধের পাতিলটা নিয়ে এসে ঘরের ভেতর ঢুকলেন। সেই বড় গামলা্টা বের করলেন। দুই প্লেটের সব ভাত সেখানে ঢাললেন। আমরা আম গুলা ছিলে রাখলাম। তিনি সব দুধ ঢেলে ভাত মাখালেন। তারপর আম কচলিয়ে সেগুলাও মাখালেন।

তারপর খাওয়ার আগে দুয়া করলেন, “আল্লাহ আমার মাথাত চুল যতগুলান ততগুলান নেক এই পুলাগুলান রে দিয়ো, আর আমার পুলা মাইয়াগুলারে মাফ কইরা দিয়ো”

তারপর গামলা থেকে হাত দিয়ে কিছু আম দুধ ভাত নিলেন, মুখে তুলতে গিয়ে হঠাৎই যেন থমকে গেলেন। আমি তাকিয়ে দেখি তার চোখ ভর্তি পানি, অঝোর ধারায় পরছে। হঠাৎই আবার তার কাশি শুরু হলো, এবারের মাত্রাটা যেন বেশি…হাত দিয়ে নেয়া ভাত গামলায় রেখে দিলেন…পা ছাড়িয়ে কাশতে কাশতে সেখানেই শুয়ে পরলেন…তার কাশির ধরন দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম…কাশিটা আস্তে আস্তে কমতে থাকলো… তার বাম হাত টা সরে গিয়ে মাটি খামচে ধরলো…এবং এক সময় তার শরীর পুরো স্থির হয়ে গেলো।

এবং তারপরে তাকে মাটি ছেড়ে আর উঠতে দেখিনি। আমি কেন আর কেউই কখনো দেখবেনা।

মনে পরে…

তার দাঁতহীন হাসি মুখ, ঠুকঠুক করে হাটা, দুর্বল হাতে হাতুড়ি দিয়ে ব্যাটারি ভাঙা, হরেক রকমের জিনিসের ঢাকি নিয়ে তার বলা সেই কথা, “নিবেন নাকি মাগো আলতা, চিরুনী, খোপা, টিপ…কম পয়সায় দিয়া দিমুনে মা গো…নিবেন নাকি?” এবং তার কাছে সেই ঘাটা-খিচুড়ি খাওয়া সবই মাঝে মাঝে আমার এখনো মনে পরে।

এবং এটাও মনে পরে তার মৃত্যুর সেদিন রাতের কথা। পুরো রাত #ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়েছিলো। হয়তো প্রকৃতিও তার প্রিয় এক মানুষকে হারিয়ে ইচ্ছামতো কেঁদে নিয়েছিলো।

লেখা ঃ FH Shishir

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here